আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > লাইফ-স্টাইল > ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনী: বাউন্ডুলের দিনরাত্রি

ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনী: বাউন্ডুলের দিনরাত্রি

মোহাম্মদ আনোয়ার, ইতালি থেকে

পর্ব ৩

নিজের গায়ের রঙ নিয়ে সম্ভবত দুনিয়ার কোন প্রান্তের লোকেরাই খুশী নন। কেন কে জানে!! আমাদের দেশে ফেয়ার এন্ড লাভলী বা ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসাম ক্রীম বিক্রি নিয়ে বহু কথা হয়। আমরা আমাদের খানিক ময়লা রঙ থেকে কিছুটা ময়লা তুলে সেটাকে সাদা সাদা করতে চাই। হয় কি হয় না সেটা পরের ব্যাপার, চেস্টা তো করা-ই যায়!

ইউরোপ জুড়ে গায়ের রঙ ময়লা করার শত শত ভিন্ন ভিন্ন ক্রীম আছে। শুধু ক্রীমে যাদের মন ভরে না তাদের জন্য আছে ট্যানিং এর দোকান। সেখানে গিয়ে শরীরে এক টুকরো লেগে থাকা কাপড় কোন রকমে পরে দাঁড়িয়ে থাকলে মেশিন থেকে একধরণের রঙ বেরিয়ে এদের সাদা সাদা চামড়াকে খানিক ময়লা ময়লা বাদামি করে দেয়! আহা! অনেক আগে আমাদের দেশের রাস্তার পাশের স্টিলের আলমারির দোকানের সামনে যেভাবে স্টিল রঙ করতে দেখতাম সম্ভবত সেই একই ভাবে। আমার চামড়া জন্মের পর থেকেই বেশ ময়লা ময়লা। নয়ত একবার এই ট্যানিং দোকানগুলোতে ঢুঁ মেরে নিজের রঙ খানিক আরো ময়লা করে নেয়া যেত!

ইউরোপে সূর্য রোদ দেয় ডিম ডিম আলোর মত। একটা চল্লিশ ওয়াটের বালব বিরাট এক হলঘরে লাগিয়ে দিলে যেমন হবে অনেকটা তেমন! তেজ কম বছরের বেশির ভাগ সময় জুড়ে। তাই সামান্য রোদ পেলেই এরা নিজেদের সাদা সাদা ত্বক খানিক ময়লা করার তোড়জোড় লাগায়। এই তোড়জোড়ের ব্যাপার স্যাপার দেখে বুঝতে পারা যায় দিনের তাপমাত্রা। যত গরম শরীরে তত কাপড় কম!!18447177_10211663699460714_5420871779707280704_n

নীল নীল নীলচে পানির কোন লেক বা বালু বালু ঘোলা সমুদ্রের পাড়ে গেলে ব্যাপারটা আরো ভাল টের পাওয়া যায়। সার বাঁধা আবরণহীন সাদাটে সাদা পিঠ দেখে। সেদিন তাপ তেমন কিছু ছিল না আমাদের জন্য। আমরা তাপের দেশের মানুষ। কিন্ত যাদের দেশে তাপ খুঁজে নিতে হয়, তারা সেই পাহাড়ি লেকের ধারের সবুজ ঘাসের গালিচায় তোয়ালে বিছিয়ে পিঠের রঙ পাল্টাতে মন দিয়েছে বোঝা গেল এদিক ওদিক তাকিয়ে।

না না, অন্য কিছু ভাববেন না যেন। আমরা তাকিয়েছি শুধু! কিচ্ছুটি দেখিনি। একদম না।

গাড়ি থামিয়ে নামতে গিয়ে দেখি খুব মিহি ধুলো। পা ফেললেই ধুলোর একটা আস্তরণ বাতাসে উড়তে শুরু করে। লেকের পাড়ে এসেও দেখলাম কালো কালো বালুতে পাড় ছেয়ে আছে। এগুলো সেই আগ্নেয়গিরির রেখে যাওয়া চিহ্ন কিনা কে জানে। লেকের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট দ্বীপ আছে। বিরাট বিরাট গাছে ছাওয়া। আর গাছের উপর দিয়ে মাথা উঁচু করে আছে একটা গির্জা। এই ব্যাপারটা সব জায়গায় দেখা যায়, সুন্দরতম স্থানে উপাসনালয়গুলো বানানো হয়। কেন কে জানে!

আমাদের ডানে ছোট্ট একটা শহর। তিন দিক লেকের ভেতর চলে গেছে শহরটার। দেখে মনে হচ্ছিল যেন লেকের উপর ভাসছে গোটা শহরটা। শহরের প্রান্তে নানান সাইজের ইয়ট রাখা। ইউরোপিয়ানদের এই ব্যাপারটা মজার এরা খানিক সচ্ছল হলেই ইয়ট কিনে ফেলে। বাড়ি, গাড়ি, ইয়ট সব কিছুর জন্য ব্যাংক থেকে লোন পেলে আমরাও কিনতাম হয়ত!

18485392_10211663701140756_4056625343348519581_nলেকের একদম পাড়েই পাওয়া গেল একটা পিতজেরিয়া। এর আগের রাত থেকেই পিৎজা খাওয়ার জন্য আমাদের জান আত্মা ছুটে গেছে। সালাহ ভাই এর আগের এসেছিল যখন তখন উনাকে এক টুকরো পিৎজা খাইয়েছিলাম ভ্যাটিকান এর সামনের এক বিখ্যাত পিৎজার দোকান থেকে। সেটা মনে ধরেছে উনার। এবারও আমরা এই কোয়াতর ফরমাজ্জো বা চার চীজের পিৎজা অর্ডার করলাম। সাথে আরো দুটো ভিন্ন ধরণের পিৎজা নিলাম। একটা টুনা আর পেঁয়াজ দেয়া আরেকটা মাশরুম দেয়া। চার চীজের মধ্যে একটা থাকে গরগনজোলা নামের। এই চীজটা অনেকদিন ধরে ম্যাচিওর করা হয়, চীজের মাঝে মাঝে কালো কালো ফাঙ্গাস পড়ে এর মধ্যে এক ধরণের তীব্র গন্ধের সৃষ্টি করে। জিভে লাগলেই সেই ঘ্রাণ জিভ-নাক পেরিয়ে মগজে গিয়ে এক আরাম আরাম অনুভুতি দেয়। বাকি তিনটা চীজের মধ্যে একটা হল মোতজারেল্লা। এই চীজ হয় দক্ষিণ ইতালিতে। মহিষের দুধ থেকে। প্রায় সব পিতজাতে এই চীজ থাকবেই। মজার ব্যাপার হল এই চীজ গোল গোল স্পঞ্জ রসগোল্লার মত হয় দেখতে। থাকেও নোনা পানিতে ডুবানো। আরেকটা হল পারমিজানো চীজ। এটা আসে উত্তর ইতালির পারমা নামের এলাকা থেকে।

এই কোয়াত্র ফরমাজ্জো পিৎজা প্রথমে দুই ধরণের চীজ টপিং এ দিয়ে আভেনে দেয়া হয় বেইক হওয়ার জন্য। আধা হয়ে গেলে বের করে আরো দুই ধরণের চীজ ছড়িয়ে দেয়া হয়। খুব খেয়াল করে খেলে চারটা চীজ এরই আলাদা স্বাদ জিভে লাগে।

আমরা বসলাম রেস্তোরাঁর সামনের খোলা চত্বরে। সবুজ ঘাসের উপর বসানো টেবলে। এক পাশে নীল পানির লেক। সামনে … আচ্ছা, সামনে কি কি ছিল সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাই। তবে, একটা ব্যাপার আপনারা খেয়াল করেছেন হয়ত এই দুনিয়াতে অনেক কিছুই খাওয়ার চেয়ে দেখায় মজা বেশি হয়! মানে, চীজ এর সৌন্দর্যের কথা বলছিলাম আর কি! নানান ধরণের চীজ!

18485747_10211663702020778_8488685254051394294_nধীরে সুস্থে খেয়ে ধিরে সুস্থে হেঁটে গাড়িতে চড়ে ধিরে সুস্থে আমরা রোমের পথে চললাম।

যাওয়ার সময়ই এক জায়গায় দারুণ কিছু চোখে পড়েছিল। সেখানে থামলাম। এক পাশে দিগন্ত বিস্তৃত আঙ্গুর বাগান। আর এক পাশে বুনো ফুলের একটা জমি। বিশাল বড় এলাকা জুড়ে। একটা টিলার গা বেয়ে ধিরে নেমে যাওয়া। বুনো ফুলের ক্ষেতে গিয়ে আমরা চার বন্ধু বাচ্চাদের মতন ছুটাছুটি করলাম। এদিক থেকে ওদিক। অন্তত দশটা ভিন্ন রঙের ফুলের সমাহার হয়েছে যেন। এর মাঝে টিউলিপটা কেবল চিনতে পারলাম। উজ্জ্বল কমলা রঙ যে কতটা মন মাতানো হতে পারে সেদিন বুঝেছি। টিলার একেবারে মাথার উপর একটা বাংলো আছে। হিংসে হল সেখানে যারা থাকে তাদের উপর। এমনিতে আমার হিংসে হয় না কিছুতে। কিন্ত সেদিন করতে ইচ্ছে হল। ওই টিলার উপরের কারুর কামরার জানালা খুললেই ফুলের বাহার আর নীল পানির হাতছানি!

মাঝে মাঝে মনে হয় স্বর্গ আসলে এই দুনিয়াতেই আছে। খুঁজে নিতে হয় কেবল!

ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনী: বাউন্ডুলের দিনরাত্রি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে