আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > সোহাগ পারভেজ এর গল্প ‘তেমন গৌরী হও’

সোহাগ পারভেজ এর গল্প ‘তেমন গৌরী হও’

সোহাগ পারভেজ
সোহাগ পারভেজ

     ‘তেমন গৌরী হও’

  “আমাকে কি নিতে চাও? কত জরি ছড়াও সুন্দরী

দুই হাতে ঝরাও ঝালর

আমাকে কি নেবে তুমি? কখনো দেখিনি আগে চোখে

এত নিরুপম ভালোবাসা

তোমার মেদুর হাসি ধরেছি বিশ্বের পাশাপাশি

আণবী ছটায় জ্বলে ঠোঁট

আমাকে কি নিতে চাও? নেবে কোন শূন্য মাঠ থেকে?

হায় তুমি অন্নপূর্ণা আজ!

চাও শুধু সমর্পণ, একে একে সব নাও খুলে

মেদ মজ্জা হৃদয় মগজ

তারও পরে চাও আমি খোলাপথে হাঁটু ভেঙে বসে

হাতে নেব এনামেল বাটি

জড়াও রেশমদড়ি কত জরি ছড়াও সুন্দরী

দিনে দিনে চাও পদতলে

ভিখারি বানাও, কিন্তু মনে মনে জানোনি কখনো

তুমি তো তেমন গৌরী নও!”–

                                                                                                   -শঙ্খ ঘোষ

                        প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের হরিপদ দত্ত লেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়েজ হোস্টেলের পেছনে জলাশয়ের অপর পাড়ে হরিপদ দত্ত লেনের আঁকাবাঁকা গলির শেষ মাথার দিকে আড়াইতলা বাড়ির দোতলার যে ঘরটার ঝুলবারান্দা থেকে বয়েজ হোস্টেলের জানালাগুলো দেখা যায়, সেখানে বসে আছেন ওই বাড়ির মা গৌরী ঘোষ। বাংলা ১৩৭৮ সনের আষাঢ় মাসের এই বৃষ্টিস্নাত সকালে সামনের জলাশয়ে কলমীলতার ঝোপে চড়ুই আর জলফড়িং এর আনাগোনা মহানগর কোলকাতার জঙ্গমে থেকেও গৌরী ঘোষকে তাঁর শৈশবের স্মৃতিতে অবগাহন করায়।

অবিভক্ত বাংলার নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া অংশে কুমারখালী থানার চাঁদপুর গ্রামে ছিল তার জন্মনিবাস। শৈশবে দীঘির জলে অবগাহনের আনন্দস্মৃতি তাকে আচ্ছন্ন করে। হোস্টেলের তরুণ ছাত্ররা ওপারের আড়াইতলার মাসিমাকে যতটুকু দেখতে পায়, নিজেদের মাঝে আলাপ করে- দেখেছিস্‌! মাসিমা নায়িকা হতে পারেতেন, সুচিত্রা সেনের মত গড়ন, গায়ের রংটা যদি চাপা না হত, বেশ হত, টালিগঞ্জ তো দূরে নয়, মাসিমা সহজেই কাজে যেতে পারতেন। অপরজন বলে- চাপা কোথায় দেখ্‌লি? উনি তো কৃষ্ণসুন্দরী, কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি………

আর অপরদিক থেকে মাসিমা গৌরী তরুন ছাত্রদের অবয়বের মাঝে খুঁজে দেখার চেষ্টা করেন তাঁর মনের কোণে মৌরসিপাট্টা গেঁড়ে থাকা ছাদী মোল্লাকে, যার সাথে গৌরীর আর কোনদিনই দেখা হবেনা।

-প্রথম যেদিন ছাদীর সাথে দেখা হয়েছিল, গৌরীর বয়স তখন ১৮। এত বয়সেও মেয়ের বিয়ে না দেওয়ায় সুবল ঘোষকে নিন্দামন্দ শুনতে হচ্ছে প্রায়শই। গৌরীর মামা নন্দকুমারের রাজসিক বাড়ির প্রাঙ্গণে বিচার গানের আসর বসেছে। পাশের গ্রাম মোহননগরের লুৎফর মৌলবির দলের সাথে বিচার গানের লড়াই হচ্ছে চাঁদপুরের মধু ঘোষের দলের। প্রাঙ্গণের মাঝখানে বাঁধা মঞ্চের ওপর দুই দলের গানের লড়াই উপভোগ করছে চারপাশে ঘিরে থাকা দুই গ্রামের অনেক মানুষ। লুৎফর মৌলবির পাশে বসে সঙ্গত দিচ্ছিল ছাদী মোল্লা। বার বার চোখ যাচ্ছিল তাঁর দর্শকমন্ডলীর মাঝে বসা গৌরীর দিকে। গৌরীও কি এক সন্মোহনে পড়ে গেলেন ওই কালো মানুষটির চোখযুগলে।

গৌরীর পাশে বসে মিনি কাকীমা তন্ময় হয়ে দক্ষ কবিয়াল লুৎফর মৌলবির তাৎক্ষনিক মুখে মুখে বাঁধা গান শুনছিলেন। কাকীমার খেয়াল ছিলনা যে, মঞ্চের ওপর থেকে তাকালে তাঁর বসার ভঙ্গীতে শাড়ির নীচের দিক থেকে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। বুদ্ধিদীপ্ত লুৎফর মৌলবি অন্যদের নজরে পড়ার আগেই মিনি কাকীমাকে চলমান গানের কলি দিয়েই ইশারায় সতর্ক করে দিলেন- “ ডুব দিয়ে দেখ পাতাল কত দূরে রে”।  বুঝতে পেরে নিজেকে সামলে নেন কাকীমা এবং আরও কেউ কেউ বুঝে হেঁসে ওঠে। ততক্ষণে গৌরী আর ছাদীর চার চোখের বার্তা বিনিময় নিবন্ধিত হয়ে গেছে কালের পৃষ্টায়।

এই বিচার গানের আসরের মাসদুয়েক পরেই একদিন হঠাত দুই গ্রামের মানুষ অভাবনীয় অবাকতায় দেখতে পেল যে, গৌরী ঘোষকে বধু করে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছে সরোয়ার হোসেন মোল্লা। মানে ছাদী মোল্লা। শুধু সম্প্রদায়ের বাঁধা অতিক্রম করেই নয়, ছাদীর ঘরে বউ আছে জেনেও গৌরী এসেছেন। ওই বৃহৎ স্পষ্ট চোখযুগলের আহবান তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। কিন্তু ছাদীও পারেননি সামাজিক চাপ উপেক্ষা করতে। সে নিজেই গ্রামের সালিশি বিচারক। তার এহেন কাজ নিয়ে অনেকেই মনঃক্ষুণ্ণ। পরবর্তী দুইমাসের মধ্যে বুক ভরা পাহাড়সম বেদনা আর চোখ ভরা অশ্রুজলে গৌরীকে মোহননগর থেকে চাঁদপুরের এক কিলো দীর্ঘতর পথ একা হেঁটে বাবার বাড়ি ফিরে যেতে হল।

সুবল ঘোষ নিজের সন্মান রক্ষার্থে মেয়েকে ত্যাগ দিয়েছিলেন। এমনকি মেয়ের যাতে ভরণ পোষণে অবহেলা পেতে না হয়, তিন বিঘা কৃষি জমি লিখে দিয়েছিলেন ছাদীকে। জমিও গেল, সন্মান গেল, মেয়ে বিপর্যস্ত হয়ে ফিরে এল। সুবল ঘোষ মনঃস্থির করলেন গৌরীকে আর রাখবেননা গ্রামে। নিয়ে চলে এলেন কোলকাতা। গ্রামের সমূদয় স্থাবর-অস্থাবর বিক্রয় করে কোলকাতায় হরিপদ দত্ত লেনে আবাস গড়লেন। প্রিন্স আনোয়ার শাহ মেইন রোডে বড় মুদি মালের দোকান খুললেন লক্ষীভান্ডার নামে। ক্রমেই লক্ষীভান্ডারের উপার্জন উপচে পড়তে লাগলো। যে ছেলেকে ম্যানেজার নিয়োগ করেছিলেন, তাঁর পরিবারের সাথে কথা বলে গৌরীর সাথে বিয়ে দিয়ে ঘরজামাই করলেন। গৌরীও নিজেকে গুছিয়ে নিলেন নতুন জীবনে। বাবার মৃত্যুর পর স্বামীর সাথে লক্ষ্মীভান্ডারের হাল ধরলেন। ছেলে মেয়ের মা হলেন, সন্তানেরাও প্রচলিত নিয়মে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপর্ব সমাপ্ত করে যার যার মত প্রতিষ্ঠিত। সবকিছুই ঠিকঠাক মত চলছে। যেমন চলছে প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে নিজের দোতলার শোবার ঘরের ঝুলবারান্দায় বসে, জলাশয়ের দিকে তাকিয়ে গৌরী ঘোষের অনিচ্ছায় ফেলে আসা কিংবা তাকে উৎখাত করে দেওয়া মোহননগর-চাঁদপুরের স্মৃতিতে আচ্ছন্ন অবগাহন।

সকাল সাতটা পর্যন্ত গৌরী ঝুলবারান্দায় বসেন, আটটার মধ্যে লক্ষ্মীভান্ডারে যান। বাংলা আষাঢ় মাস, মানে ১৯৭১ এর জুন চলছে। গৌরী এবছরের এপ্রিল থেকে এক নতুন কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। তাঁর জন্মস্থানের দেশ- বাংলাদেশ নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। বিবিসি শুনে জানতে পেরেছেন মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক প্রতিরোধ শুরু করেছে বাংলাদেশের মানুষ। পাক হানাদার আর্মি সেখানে পাইকারি গনহত্যা চালাচ্ছে। তিনি ফেলে আসা মায়ায় ছাদীর জন্য শংকিত হন,সে কেমন আছে? সহসা জানার উপায় নেই, তবু জানতে ইচ্ছে হয় গৌরীর। দলে দলে যশোর রোড দিয়ে শরণার্থীর ঢল নেমেছে। তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছে সল্টলেকের বিস্তীর্ণ নিচু ভূমিতে। তাবু এবং ড্রেনেজ সিস্টেম নির্মাণের জন্য রাখা ৭২ ইঞ্চি ব্যাসের অসংখ্য কংক্রিট পাইপ হয়ে উঠেছে নিরন্ন নিরাশ্রয় মানুষের আকাশের নিচের আশ্রয়।

লক্ষ্মীভাণ্ডারের পেছনের প্রাঙ্গণে বড় দুটো চুলা তৈরি করিয়েছেন গৌরী। শেড এর তলায় স্তুপ করিয়েছেন প্রচুর জ্বালানী কাঠ। শরীফন বেওয়া দুজন সহযোগী নিয়ে প্রতি সকালে এখানে বড় দুই ডেক এ সবজি-খিচুড়ি রান্না করেন। প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড যার নামে, সেই আনোয়ার শাহ ছিলেন মহীশুরের টিপু সুলতান-এর কোলকাতায় নির্বাসিত বংশধর। তার অধস্থন বর্তমান বংশধরেরা সকল জৌলুস হারিয়ে রিকশাচালক, মুটে-মজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। শরীফন বেওয়া তাদেরই একজন। রান্নার হাত খুব ভালো শরীফনের। অনেকদিন ধরেই গৌরীর গৃহকর্মী এবং আপ্‌না লোকের মতই। প্রতিদিনই সকাল থেকে যারপরনাই পরিশ্রম করে বেলা ১০টার মধ্যে খিচুড়ি প্রস্তুত করে শরীফন। দোকানের দুজন কর্মচারি সহ পিকাপ ভ্যানে করে সেই খিচুড়ি নিয়ে সল্টলেকে যান গৌরী। অন্ততঃ হাজার খানেক শরণার্থীর একবেলার খাবার জোটে তাতে।

কিন্তু সল্টলেকে তো শরণার্থী হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ। বেনাপোল সীমান্ত থেকে বনগাঁ, বাদুরিয়া, গাইঘাটা , আমডাঙ্গা, অশোকনগর, বারাসাত, দমদমের পথ দিয়ে প্রতিদিন দলে দলে জয়বাংলার নিরন্ন নিরাশ্রয় মানুষেরা ভীড় বৃদ্ধি করছে সল্টলেকে। ক’জনের জন্য আর গৌরী সাহায্য করতে পারেন? একদিন সল্টলেক থেকে ফেরার পথে গেলেন কস্‌বা-তপসিয়ার পাশে কুষ্টিয়া রোড এলাকায়। ৪৭ এর পর গৌরীর জন্মজেলা কুষ্টিয়া থেকে আসা উদ্বাস্তুরা এখানে বসতি গড়েছে সন্মিলিত হয়ে।  কুষ্টিয়া মস্‌জিদ বাড়ি লেন এর সাবের শেখ গৌরীর বাবা সুবল ঘোষের বাল্যবন্ধু, তাঁর বাড়িতে বসে পাড়ার মা কাকী পিসি সকলকে ডেকে নিয়ে বললেন- সবার সাধ্যমত সহযোগীতা করে তহবিল গঠন করতে হবে। রাস্তায় রাস্তায় গানের দল নিয়ে যেয়ে অর্থ সাহায্য সংগ্রহ করতে হবে। সেইমত গত দুইমাসে বেশ তহবিল গঠন হয়েছে। বেশকিছু স্বর্ণালংকার পাওয়া গেছে। গৌরী নিজের আট ভরি সোনার গহনা তহবিলে জমা করলেন।

গৌরীর দু’চোখ সল্টলেকের শরণার্থীদের মাঝে খুঁজতে চেষ্টা করে তাঁর শেকড়ের কোনো চেনা মুখ দেখা যায় কিনা। কাউকে পেলে তাঁর বুকের মাঝে পুষে রাখা অনিবার্য মায়া একটুখানি পরিতৃপ্তির সান্ত্বনা নিতে পারতো।

একদিন সল্টলেকে খাবার বিতরণ শেষে অর্জিত তহবিলের সংগ্রহ সরকারী কোষাগারে জমা দিতে কুষ্টিয়া রোডের প্রবীণ কয়েকজনকে নিয়ে ৮/থিয়েটার রোডে গেলেন গৌরী, যেখানে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কার্যালয়। থিয়েটার রোডে গৌরীর জন্য অপেক্ষা করছিল অভাবনীয় প্রাপ্তি। চাঁদপুরে তাদের প্রতিবেশী আমজেদ ভাইয়ের বউ সালমা ভাবীর ছোট ভাই আমিরুল ভাইয়ের সাথে দেখা হল। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের প্রধান সহকারী ব্যারিষ্টার আমির উল ইসলাম। কার্যালয়ের করিডোরে অভ্যাগতদের জন্য রাখা চেয়ারে বসে ছিলেন গৌরী। একটা কক্ষ থেকে আমিরুলকে বের হতে দেখেই ‘বেয়াই’ বলে চিৎকার করলেন। চমকে তাকিয়ে সহসাই চিনলেন আমিরুল। গ্রামের খবরাখবর জানতে উদগ্রীব হয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করলেন আমিরুলকে। গৌরী ভুলে গেছেন যে তাঁর আমিরুল ভাইয়ের বাড়ি চাঁদপুরে নয়, মধুপুরে। ২৫ শে মার্চ রাতে পাক আর্মি কতৃক ঢাকায় গনহত্যা চালানোর পরদিন তাজউদ্দীন কে সাথে নিয়ে মৃত্যু ঝুঁকি নিয়েই সীমান্তে এসে দেশ ছেড়েছেন। প্রবাসী সরকারের গঠন ও তদারকিতে সংযুক্ত এই কঠিন সময়ে গ্রামে কে কেমন আছে সেই খবর আমিরুল রাখতে পারেননি। তবে তিনি সেখানেই তখন উপস্থিত থাকা আমজেদ ভাইয়ের ছোট ভাই সামছেলের সাথে দেখা করিয়ে দিলেন গৌরীকে। তাকে পেয়ে গৌরীর বাষ্পরুদ্ধ আবেগ ধীর লয়ে বিস্ফোরিত হতে হতে ফুঁপিয়ে উঠলো। সামছেলের কাছ থেকে গৌরী জানতে পারলেন- ছাদী মোল্লা গ্রামে থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করছেন। ছাদী মোল্লার স্ত্রী মরিয়ম মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিজের বাড়িতে খাবার রান্না করেন। চিড়া মুড়ি গুড় রুটি তরকারির পোটলা নিয়ে ছেলে লাল মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আস্তানায় পৌঁছে দেয়। কি এক অপরিমেয় তৃপ্তিতে উচ্চারণ করলেন গৌরী- জয় বাংলা!

25-beautiful-south-indian-women-paintings-by-ilayaraja-8

১৯৭৬ সনের ডিসেম্বর মাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ৫ বছর অতিবাহিত হয়েছে। স্বপ্নভঙ্গের নিদারুণ বেদনার যবনিকায় বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরে সামরিক শাসনের অধ্যায় শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। পশ্চিমবঙ্গে ইন্দিরা জামানায় স্বিদ্ধার্থ শংকর রায়ের জরুরী শাসন শিথিল হবার উপক্রম, বামফ্রন্টের ক্ষমতায় আসার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। গৌরী ঘোষ আরেকটু বৃদ্ধা হয়েছেন। স্বামী প্রয়াত দু’বছর হল। লক্ষ্মীভাণ্ডারের আরো দুটি শাখা খুলেছেন গড়িয়াহাট ও গনেশ টকিজের মোড়ে। ছেলেদের দায়িত্ব সমঝে দিয়ে নিজে অবসর যাপন করছেন। প্রায় সময় তাঁর ঘরের সেই ঝুলবারান্দায় বসে অতিবাহিত করেন। এখন আর এই বৃদ্ধাকে বয়েজ হোস্টেলের বর্তমান শিক্ষার্থীদের নজরে পড়েনা তেমন। নাতিদের নিয়ে গাড়ি করে মাঝে মাঝে বিকেলে ঢাকুরিয়া লেক বা রয়েল ক্যালকাটা গল্‌ফ ক্লাবের কাছে হেঁটে আসেন। ওই দুটি জায়গায় যেয়ে তিনি মূলত চাঁদপুর মোহননগরের অবারিত সবুজের বিকল্প পরশ পেতে চান। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটান। যেমনটা বুকের মাঝে পুষে রাখেন ছাদী মোল্লাকে।

কুয়াশাচ্ছন্ন ১৬ই ডিসেম্বর সকালে নাতি সুব্রত এসে গৌরীকে জানাল- দিদা, তোমার দেশের লোক এসেছেন দেখা করতে। গৌরীর শিরা উপশিরায় শীতল রক্তে উষ্ণ হিমবাহ প্রবাহিত হল যেন। নিচতলায় বসার ঘরে এসে দেখেন পরিবারের গোটা পাঁচেক সদস্য সমেত বসে আছে নিবারণ মন্ডল। মোহননগরের অপর পাশে শ্রীপুর গ্রামের নিবারণ বলল- মনে পড়েচে গৌরী দি? তুমার আর ছাদীর বিয়েতি আমি যুগার যান্তি করিছিলাম? কি ঝুকি নিয়েই যে তুমারে বিয়েডা হইছ্‌লো।

–     ওসব কথা থাক নিবারণ। কয়া আর কি হবি? তুমার খবর কও, মনে হচ্ছে এহেবারে দেশ ছাড়িছো? এম্মা আইস্‌লে কি জন্যি?

–     দিদি, আমরা শুনিচিতো, তুমি শরোনাত্তিরে কত উপকার করিছিলে। দেশ তো আর সেইরম নিইকো দিদি। ক্যাম্বা যিন হয়া গেছে। টিক্‌তি পারলামনা। চিষ্টা করিছ্‌লাম যাতে বাপের ভিটেই মরতি পারি। পারলামনা। ছাওয়াল মিয়াগুন তো বাঁচাতি হবি। একদিন রাইত করে হাসেল ঘরে চুলো জ্বালা থুয়ে মান্‌ষির অন্‌গোচরে পথে বাইর হয়া আইছি। জানতাম তুমি একেনে আচো। টূকটাক গয়না টাহা-পয়সা নিয়ে আইছি। আমারে এট্টা ব্যবস্থা করে দ্যাও।

–     সেসব হবিনি নিবারণ। বাড়ির দিককার মান্‌ষির খবর থাকলি কিছু কও।

–     কি কব দিদি, শ্যাষের কয়দিন তো ছাদী ভাই’র জন্যিই বাঁচে আইছি। নালি পরে কোপ খ্যায়া সব লুট হয়া যাতো। সে কোনোরহম জমি-যাতি বিক্রির বন্দোবস্ত না করে দিলি টাহা পয়সা কিছুই পাতামনা। সেই বুল্ল তুমার কাছে আস্‌তি। দিদি, তিনি তুমাক এক্‌খেন পত্র দেছেন।

–     আমি শরীফনেক কয়া দিচ্ছি, তুমরা খ্যায়া দ্যায়া জিরেও। পরে দ্যাখা হবিনি।

কথা শেষ করে গৌরী দ্রুত তাঁর দোতলার কক্ষে এলেন। ঝুলবারান্দায় রাখা ডিভানে বসে  কম্পিত হাতে নব প্রেমে আবদ্ধ তরুণীর আবহ মিশ্রিত তথাপি পোড় খাওয়া তনুমনের আবেশিত নারী তাঁর পরম কাঙ্ক্ষিত কিন্তু অনাহুত পত্রখানা ভাঁজ খুলে পড়তে লাগলেন-

“ তোমাকে কিছু কথা বলার জন্য যে সৎ সাহস থাকা প্রয়োজন তা আমার নাই। তবুও সত্য এই যে আমি তোমাকে মোহপাপ নিয়ে ভালোবাসিনাই। আমি যে তোমারে ভুলিনাই কখনও। সমুদ্রের ন্যায় ভালোবাসি তোমায়, তাই সংসার প্রতিপালন করে, প্রচল মুল্যবোধ অতিক্রম করে আজো তোমায় মনে রেখেছি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধায়।  অতীতে ফিরে দেখি তোমার প্রতি অবিচার করেছি। আমি প্রথা ভাঙতে চেয়েছি কিন্তু প্রথা ভাঙ্গার যোগ্যতা আমি অর্জন করতে পারিনি। আমার খামখেয়ালী ও খরুচে জীবন যাপন তোমার প্রতি অবহেলা হয়ে তোমাকে অন্যায়ভাবে বিপর্যস্ত করেছে।

গৌরী, তোমার প্রতি অপরাধের শাস্তি আমি পেয়েছি। আজ আমি প্রায় কপর্দকশূন্য বলা যায়। যাত্রা, গান, ফুটবল যেসব দেখে তুমি আমার প্রতি মুগ্ধ হয়েছিলে, সেসব আজ অপসৃত। সকল জমি-জমা বিক্রয় করে শেষ। উপার্জন তো করিনি যা ছিল তাও নিঃশেষ হয়েছে। তুমি তো জানোই, আমি মানুষজন খাওয়াতে এবং নিজেও খেতে খুব ভালোবাসি। এই অভাবের দিনেও অভ্যাসটা রয়ে গেছে। মৃত্যুর অপেক্ষায় অসুস্থ আমি জেনে শান্তি পেয়েছি যে, কিভাবে তুমি ৭১এর নয়মাস হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্যের যোগান দিয়েছো। আমি দূর থেকেও বুঝেছি কোন ভালোবাসার আবেশ গৌরীকে মহৎ কাজের প্রেরণা দেয়। সে গৌরী কালো, সে গৌরী ভিনজাত এসব ঠুনকো অপবাদে নিগৃহীত গৌরী নয়। সে গৌরী স্বমহিমায় ভাস্বর অপরুপা গৌরী।

তোমার আমার তারুণ্যের দিনের গ্রাম অনেক বদলে গেছে। চারপাশে যেন কারাগারের শাসন, মনে হচ্ছে যেন এক আদিগন্ত কারাগার আমাদের চারপাশের সবকিছুকে নাগপাশের মত ক্রমাগত শক্ত বাঁধনে বন্দী করতে করতে পিশে মেরে ফেলবে। আজীবন একসাথে বাস করা নিবারণদের ধরে রাখতে পারছিনা। আমার সেই শক্তি নিঃশেষিত। গ্রামের সালিশে আগের মত আধিপত্য নাই আমার। সততার মুখোশ পরে নতুন প্রতিপত্তি পাওয়া মাতব্বরদের বেশীরভাগ গিরগিটির মত রঙ বদলিয়ে বিত্তশালী হয়ে উঠেছে, যাদের সঙ্গী হওয়া বিব্রতকর। আর বাঁচবই বা ক’দিন।

তুমি জেনে খুশী হবে, আমি একটা ভালো কাজ অন্ততঃ করেছি। মোহননগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য আমার পৈতৃক ভিটার বড় অংশ ছেঁড়ে দিয়েছি। আগামী দিনের শিশুরা এখানে শিখে বড় হবে। তারা কি প্রথা ভাঙতে শিখবে? মুল্যবোধের অচলায়তন প্রতিনিয়ত নবায়ন করার কান্ডজ্ঞান অর্জন করবে? আগামীর সন্তানেরা আমার মত অর্বাচীন না হয়ে তোমার মত গৌরী হতে পারুক এই প্রার্থনা তুমি করো গৌরী। তোমাকে এই সন্মান দেওয়া ছাড়া আমার আর কিচ্ছু করার নেই, মৃত্যুর অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোথাও যাবার নেই। গৌরীময়তা সোন্দর্য্যের আবাস। পৃথিবী গৌরীময় হোক।“

পত্রের প্রতিটি বাক্য পঠিত হবার সাথে সাথে গৌরীর অশ্রুগঙ্গা যেন প্রমত্তা পদ্মার জলধারায় রুপান্তরিত হয়ে হাওয়ায় ভেসে ভেসে প্রবাহিত হতে লাগলো বাংলাদেশ পানে। সেখান থেকে বঙ্গোপসাগরের নীল লোনা জলরাশিতে মিশে পত্রালাপের বাক্যসমূহ বিশ্বজনীন হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে মহাকালের গর্ভে……….

গৌরী অনুভব করেন পার্থিব আস্বাদ। ঝুলবারান্দায় বসে পাশের ঘরের জানালার দিক থেকে শুনতে পান নাতি সুব্রত’র কণ্ঠের আবৃত্তি-

 “যখন মোহের আবেশ ভেঙ্গে পরে

 হারাবার কিছু থাকেনা অবশিষ্ট

খোয়াবার কোনো থাকেনা পিছুটান

 তখন নির্ভার হয়ে পথ চলা যায়।

  যখন অবসাদ এসে ভর করে

 বিষণ্ণ হবার থাকেনা অবকাশ

 বিষাদ আসেনা বিক্ষত তনুমনে

 তখন গন্তব্যহীন পথ চেনা যায়

   যখন পাথর ঠেলে সন্ধ্যা নামে

 বিজন প্রান্তরে থাকেনা অভিমান

 বিবশ হবার থাকেনা অবসর

 তখন নির্মোহ হয়ে পথ হাঁটা যায়।

যখন নিঃস্ব হবার অর্থ থাকেনা

 তখন নির্ভার হয়ে ভালোবাসা যায়

 যখন আদিগন্ত কারাগারময়

 ভালোবাসা দিয়ে প্রাচীর ভাঙ্গা যায়।”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে