আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > জাতীয় > দুই মেয়রকে ‘চিকুনগুনিয়া উত্তর’ ও ‘দক্ষিণ’ বলছে মানুষ

দুই মেয়রকে ‘চিকুনগুনিয়া উত্তর’ ও ‘দক্ষিণ’ বলছে মানুষ

দুই মেয়রকে ‘চিকুনগুনিয়া উত্তর’ ও ‘দক্ষিণ’ বলছে মানুষ

আহমেদ এফ রুমী:

জ্বরের নাম চিকুনগুনিয়া। সাধারণ জ্বরের মতো অন্যান্য লক্ষণের পাশাপাশি শরীর ব্যাথা, দুর্বলতা ও শরীরে র‍্যাশ ওঠাই এর প্রধান উপসর্গ। কর্মজীবী সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের সবাই ভুগেছেন চিকুনগুনিয়ায়। জ্বর সারলেও দুর্বলতা কাটে না। কারো কারো ব্যথাও থাকে অনেকদিন।

আক্রান্তদের অনেকেই এ জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধির পেছনে দায়ী করেছেন অতিরিক্ত মশা ও মশা নিধনে সংশ্লিষ্টদের  অবহেলাকে। গত দেড় মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া চিকুনগুনিয়ায় দীর্ঘদিন ভুগেছেন বহু মানুষ। কোনো কোনো পরিবারের সবাই এই জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন।cg5

সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকও চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। সম্প্রতি বেসরকারি এক টেলিভিশন চ্যানেলে দুই সিটি মেয়রের দিকে সরাসরিই আঙুল তুলেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ দুই মেয়রের পদত্যাগও দাবি করেন। মশা মারতে দুই মেয়র ব্যর্থ বলেও দাবি করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি।

এই রোগের কারণ এডিস মশা। সাধারণত দিনের বেলাতেই কামড়ায়। ঢাকা শহরে বিভিন্ন এলাকায় বর্ষা মেৌসুমে বেড়েছ মশা। আর প্রথমদিকে মশা মারতে দুই সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো উদ্যোগও চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ নগরবাসীর। এ কারণেই এভাবে ঘরে ঘরে মানুষ চিকনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়।

cg1চিকনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই ঠাট্টাচ্ছলে দুই সিটি মেয়রকে ‘চিকুনগুনিয়া উত্তর’ ও দক্ষিণ’ বলেও ডাকতে শুরু করে। সিটি করপোরেশন ফগার মেশিন নিয়ে বের হচ্ছেন ঠিকই তবে সব এলাকায় তারা যাচ্ছেন না। পূর্ব নাখালপাড়ার বাসিন্দা কাওসার জানান, তিনি একদিনও মশা মারতে সিটি করপোরেশন কর্মীদের দেখেননি।

আবার যেসব এলাকায় মশার ওষুধ দেয়া হচ্ছে সেসব এলাকার অনেকেই সিটি করপোরেশনের মশার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, ওষুধ দেয়া হচ্ছে মশাতো কমছে না।

তবে মেয়রসহ সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের মুখে অন্য কথা। তারা জানান, এরইমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এবং মেয়রদের তত্ত্বাবধানে চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব কমাতে কাজ শুরু করেছেন তারা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন সম্প্রতি চিকুনগুনিয়া রোগ নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, চিকুনগুনিয়া একটি নতুন রোগ। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই। এ রোগে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। প্যারাসিট্যামল খেলেই সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্য জ্বর সেরে যায়।

মেয়র চিকুনগুনিয়া রোগ প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ পর্যন্ত সারা দেশে এই রোগে বহু  মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ মারা যাননি। আমরা এই রোগ প্রতিরোধের জন্য জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করছি।

মশাবাহিত এই রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নিজস্ব উদ্যোগে সাধারণ কর্মসূচির পাশাপাশি বিশেষ মশক নিধন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।cg3

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মতিউর রহমান মোল্লা জানান, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করা, পানি জমে থাকার সম্ভাব্য স্থান নিয়মিত পরিস্কার করার জন্য সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব দমন সম্পর্কে তিনি বলেন, আগামী চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে রাজধানীতে মশার নিধনে কাজ চলছে।

রাজধানীর ২৩টি এলাকাকে চিকুনগুনিয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে দুই সিটি কর্পোরেশন। এসব এলাকার জ্বরে আক্রান্ত অনেকেই ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে জানতে পারেন চিকুনগুনিয়ার কথা। এতোদিন রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এ রোগ গ্রামে ছড়িয়ে পড়ায় বেশ আতঙ্কিত তারা।

cg2রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বেশকিছু হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, এখনও প্রচুর রোগী আসছেন চিকিৎসা নিতে। জ্বর কমে গেলেও শরীরের ব্যথা ও র‍্যাশ নিয়ে বেশ দুর্ভোগে পড়েছেন আক্রান্তরা।

এসব হাসপাতালের রোগীরা জানান, কোনভাবেই মশা দমন করা সম্ভব হচ্ছে না। মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি, মিরপুর, যাত্রাবাড়ি, খিলগাঁও, উত্তরাসহ অনেক এলাকায়ই মশার উৎপাত বেড়ে গেছে। কর্মীসংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রভাব পড়ছে কর্মক্ষেত্রেও।

ঢাকা সিএমএইচ’র মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কর্নেল ডা. এলাহী বলেন, চিকনগুনিয়া সম্পর্কে সবারই এখন কমবেশি ধারণা রয়েছে। তাই, সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এর জন্য ভুক্তভোগীদের পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্টদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। মশার উপদ্রব কমাতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’র অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বর্ষা মৌসুমে ঘন ঘন বৃষ্টি হওয়ায় রাজধানীসহ সারাদেশে মশার উপদ্রব বেড়েছে। মূলত: মশার কারণেই চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ কমছে না।

cg4ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শাইখ আবদুল্লাহ বলেন, চিকনগুনিয়া রোগীদের সাধারণত নাপা ও তরল খাবার খাওয়ার পাশাপাশি প্রচুর বিশ্রাম নিতে হবে। এছাড়া, সবসময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো বাধ্যতামূলক।

ডাক্তাররা বলছেন, এই রোগে আক্রান্ত হলেও প্যারাসিট্যামল খেলেই সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্য জ্বর সেরে যায়। তারা জানান, একটু সচেতন হলে সহজেই চিকনগুনিয়া প্রতিরোধ করা যায়। পানি জমে থাকে এমন স্থান সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে। মশার আবাসস্থল ধ্বংস করতে হবে। দিনে কমপক্ষে দুইবার মশা নিরোধক স্প্রে বা কয়েল ব্যবহার করতে হবে। জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

নগরবাসী মনে করেন, ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে জমে থাকা পানি ও ময়লা আবর্জনার কারণে মশার প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। তাই এর প্রাদুর্ভার রোধ করতে নিয়মিত মশা নিধন কর্মসূচি অব্যাহত রাখার দাবী জানিয়েছেন তারা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে