আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > শিল্প-সাহিত্য > ধারাবাহিক গল্প: শিকড়

ধারাবাহিক গল্প: শিকড়

10416991_10203883040897675_8914451482062484801_n
স্মৃতি ভদ্র

পর্ব ৩

বোষ্টমী দি ঝাপসা হতে হতে একসময় ধূসর বৃষ্টিতে হারিয়ে যায়। মাছের খলুই আর আচার হাতে করিম আস্তে আস্তে পা বাড়ায় নিজের বাড়ির দিকে। দিপেন্দ্যুও চলে আসে বাড়ির ভিতর।

বাড়িতে এসেই দিপেন্দ্যু বাবার গলা শুনতে পায়। বৈঠকখানার বারান্দায় বাবা বসে আছে। আর উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘরে মা।

“বুঝলে ঠাকুরণ, স্বদেশীদের কাছে এবার মনে হয় ইংরেজরা হার মানবে। এবার মনে হয় আমাদের দেশ আমাদেরকে বুঝিয়ে দিয়ে পাততাড়ি গুটাবে সাহেবরা” সদা হাস্যময় অবনী বাড়ুজ্জে বলে তার স্ত্রী উমা ঠাকুরণ কে উদ্দেশ্য করে। কুলীন ব্রাক্ষ্মণের ঐশ্বর্য আজ ফিকে হয়ে গেলেও ডাকগুলি এখনো রয়ে গেছে গালভরা। তাই দিপেন্দ্যুর মা এখনো সবার কাছে উমা ঠাকুরণ।

আর সদা নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত উমা ঠাকুরণের কাছে অন্য পাড়াও যেন সহস্র ক্রোশ দূরে। তাই নিজের বাড়ি, সংসার আর পাশের বাড়ির আমেনা ভাবির সংসার ছাড়া অন্য কোনোকিছুতে তার উৎসাহ খুব একটা চোখে পড়ে না। তাই গরুর খাবারের বিচুলি বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ায় যতটা চিন্তিত তার এককণা পরিমাণও স্বদেশী আর ইংরেজদের নিয়ে চিন্তিত নয় উমা ঠাকুরণ।

খুব চিন্তিত মুখে স্বামীকে উমা ঠাকুরণ বলেন,”আমাদের দেশ তো আমাদেরই আছে, ওসব কথা বাদ দিয়ে ভাবো গাভীগুলোর আহার কিভাবে রক্ষা করবে। যেভাবে আকাশ ভাঙ্গছে তাতে তো দু’তিন দিনে এই জলপড়া থামবে না।”

মায়ের কথাশুনে দিপেন্দ্যু কিছু বিচুলি টেনে টেনে বারান্দায় এনে রাখলো।

মায়ের কাছে এসে হাত বাড়িয়ে সর্ষের তেল নিয়ে মাথায় দিতে দিতে দিপেন্দ্যু পুষ্করিণীর দিকে চলে যায়।

আমেনা ঘরের দাওয়ায় বসে করিমের আনা মাছ কুটছে।

” করিম নাইতে যা বাপ। এরপর অবেলায় নাইলে এই বাদলে অসুখ করবো।” আমেনা গলা বাড়িয়ে বলে।

বারান্দার তারে ঝুলানো গামছা নিয়ে করিমও এগোয় পুষ্করিণীর দিকে।

দু’বন্ধুতে পুকুরের পাড় থেকে এঁটেল মাটি নিয়ে গা ঘষে, এরপর শুরু হয় করিমের ডুবসাঁতার। একটু চুপচাপ দিপেন্দ্যু কিছুক্ষণ সাঁতরে বলে,” এবার ওঠ করিম। শেষে সর্দিগর্মিতে ধরবে।”

অনিচ্ছাসত্ত্বেও করিম উঠে আসে। “জানিস ওই গাঁয়ের নবীন দা এসেছে। কোলকাতা থেকে। স্বদেশীদের অসহযোগে এখন কলেজ বন্ধ। তাই গ্রামে এসেছে। যাবি নাকি ওই গ্রামে কোলকাতার গল্প শুনতে।” এক নিঃশ্বাসে বলে করিম শেখ।

” কোলকাতার গল্প শুনবো আর কলেজেরও। আর দু’ক্লাশ পর তো আমাদের কোলকাতার কলেজেই পড়তে যেতে হবে।” উজ্জ্বল চোখ করে বলে দিপেন্দ্যু।

কাল সকালে ওই গ্রামে যাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে দু’জন নিজের বাড়ি যায়।

সেই মাগুর মাছের সালুন দিয়ে তৃপ্তি করে ভাত খেতে খেতে করিম মাকে বলে,”সালুন টা খুব সোয়াদ হইছে আম্মা।”

আমেনার রান্না সব সময়ই খুব ভালো হয়। তবুও ছেলেকে খুশী করতে বলে,” তুমি যে মাছটাই আনছো বাপ সোয়াদের। এতবড় তড়বড়া মাগুর মাছ অনেকদিন পর দেখলাম।”

” আম্মা, আমি কিন্তু কাল সকাল সকাল বের হব। দিপেনরে লইয়া পাশের গ্রামে যাবো। নবীন দা আইছে, কোলকাতার গল্প শুনতে যাবো।” মাছ ভেঙে মুখে দিতে দিতে বলে করিম।

” তা যাইও, কিন্তু কোলকাতার গল্প শুইনা কি হবে বাপ।” হেসে বলে আমেনা।

” বাহ্ রে! আর দু’ক্লাশ পরে তো সেইখানেই পড়তে যাবো। তাই আগে থাইকা জানতে যাবো। তুমি কিন্তু আব্বারে বুঝাইয়া বলবা। আমি কিন্তু যাবোই কোলকাতা।” খাবার শেষ করে উঠে পড়ে করিম।

ছেলের খাবারের এঁটো পাত গোছাতে গোছাতে আমেনা আদরের বাপধনের কথাই ভাবতে থাকে। বাপ তার কোলকাতা গেলে কিভাবে থাকবে সে।

ধারাবাহিক গল্প: শিকড়

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:
symphony

অনুরূপ সংবাদ

উপরে