আপনি আছেন
প্রচ্ছদ > লাইফ-স্টাইল > খামারেই স্বাবলম্বী কচি হিজড়া

খামারেই স্বাবলম্বী কচি হিজড়া

ছাগল

ইদ্রিস আলম:

শুক্রবারের সকাল নয়টা। উত্তরার ১০নং সেক্টরের কামাপাড়া। আব্দুল্লাহপুর টু আশুলিয়া রোডের ডান পাশে কয়েকটি টিনের ঘর। উচু সড়ক থেকে নিচে নামতেই সামনে পড়ল বাঁশের বেড়া। এর মাঝখানে ফটক। ফটকের দু’পাশের খুটিতে টাঙানো আছে একটি সাইনবোর্ড । এ সাইনবোর্ডে লেখা উত্তরণ ফাউন্ডেশন ফার্ম।পরিচালক কচি হিজড়া। ফটক ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একচালা টিনের বেড়ায় একচালা ঘর।

এর পূর্ব পাশে ষাড়ের ঘর। পশ্চিম পাশে ছাগলের থাকার ঘর, সঙ্গে হাস-মুরগির খোয়ার। কবুতর পালার ১৬ রুমের একটি খোয়ারও আছে।

খামারেই স্বাবলম্বী কচি হিজড়া

দিনের শুরু:

প্রতিদিন পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যেই ঘুম ভাঙ্গে কচির। গোয়াল ঘরেই থাকে মালা হিজড়া। এসময় মালারও ঘুম ভাঙ্গে। জমে থাকা গোবর পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট একটি গর্তে রেখে দেয়। এরপর পাইপ দিয়ে পানি ছিটানো হয়। সানসিল্ক শ্যাম্প এবং হুইল পাউডার মিশিয়ে দিয়ে গরুর গায়ে লেগে থাকা ময়লা পরিষ্কার করা হয়। এরপর আসেন ইসমত আলী। দুধ দোয়ানো হয়। সকাল নয়টা থেকে এগারোটা পর্যন্ত বালতি করে এ দুধ বিক্রি করেন কচি। ভ্যান কিংবা রিকশায় করে নয় পায়ে হেঁটে। কেউ কেউ এখানে এসে দুধ নিয়ে যান।

কেনো পায়ে হেঁটে বিক্রি করেন জানতে চাইলে কচি বলেন-একটা ভ্যান গাড়ির জন্য প্রতিদিন পাঁচশ থেকে আটশ টাকা দিতে হয়।এক কাজে এতো টাকা খরচ না করে একটি গরু কিনতে পারি।

যেভাবে শুরু:

উত্তরণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমান। তিনি কাউকে সেলাই মেশিন, পার্লার করে দিয়েছেন। আমি চিন্তা করে দেখলাম কাজ করে খাই। খেটে খাই। এ কাজে লুকোচুরি করা যাবে না। তাই স্যারকে বললাম আমি গরু ছাগলের ফার্ম দিতে চাই। এই থেকেই শুরু। এক বিঘা তিনকাটা জমির উপর খামার। দিনরাত পড়ে থাকেন এখানেই। এ বছরের মার্চ মাসের ১২ তারিখ। প্রথমে বাছুরসহ পাবনা থেকে আনা হয় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার গাভী। এ টাকা দেন হাবিব স্যার।

বাছুরসহ গাভী কেনার কারণ জানতে চাইলে কচি বলেন- বাছুর ছাড়া গাভী কিনলে কোনো গ্যারান্টি নাই। বাছুরসহ কিনলে লাভ হয়। দুধ দোয়ান যায়। এ দুধ বিক্রি করে খরচের টাকা আসে। মোহাম্মপুরের আটি বাজার থেকে কেনা হয় ৭৬ হাজার টাকার একটি গাভী। কেনা হয় ৭৩ হাজার টাকার আরেকটি গাভী। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থেকে এক লক্ষ ৭৩ হাজার টাকায় কেনা হয় তিনটি ষাড়। এ টাকা আসে গরুর দুধ বিক্রি থেকেই। নিজের জমানো টাকায় ৬০ হাজার টাকার ১৫টি ছাগল কেনা হয়। রাজশাহী থেকে আনা হয় দুটি রাম ছাগল।

খাসি আছে চারটি এবং বাকিসব দেশি ছাগল। ৬৪ হাজার টাকার ছাগল। এগুলো কেনা হয়েছে জামালপুর থেকে। এগুলো ছাগল বেশির ভাগ ঘাস খেয়ে থাকে। অন্য সময় টঙ্গী ইস্তেমা মাঠে ঘাস খাবারের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। ছাগলগুলোকে তুরাগ নদীর ঘাট পারা পারের জন্য ডিঙ্গি নৌকা কেনা হয়েছে।

তাছাড়াও এদের খাবার হিসেবে খুদের ভাত, কাঁঠাল পাতা দেয়া হয়। বেশি যত্ন নেয়ার জন্য খুব দ্রুত বেড়ে উঠছে ছাগল গুলো। তাদের গোসল, খাবার,পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও সব সময়ের জন্য খোঁজ খবর রাখতে এক জন লোক রাখা হয়েছে মাসিক ১৩ হাজার টাকা বেতনে ইসমত আলীকে। এদের খাবার হিসাবে রাখা হয়, ঘাস,খুদের ভাত ডালের গুঁড়া, ভুট্রার গুঁড়া, গমের ভুষি ও পানি দিয়ে তাদের খাবার দেয়া হয়।

কচির দিনরাত:

খামারের পূর্ব পাশে একটি ঘর। ফেলানো আছে একটি চৌকি। আছে তিনটি ষাড়। এ ষাড় দেখাশুনার জন্যই কচি এ ঘরে থাকেন। অনেক পরিস্কার গোয়াল দেখে বোঝার কোন উপায় নেই এটি গোয়াল ঘর। বিশাল বড় দুটি ষাড় থাকে এই ঘরে। ঘরে ঢুকেই দেখা যায় ষাড় দু’টো নিজ মনে ঘাস খাচ্ছে। ষাড় দু’টো বেশ মোটাতাজা।

হাস

ডিম আর দুধ থেকেই আসে টাকা:

তিনটি গাভী দুধ দেয়। ৮০ টাকা কেজি দরে দিনে ২৫ থেকে ৩০ কেজি দুধ বিক্রি হয়। এ দুধ বিক্রি করেই ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা আসে। প্রতিমাসে একজোড়া করে ডিম দেয় কবুতর। কবুতরের বাচ্চা বাইরে থেকে আড়াইশ’ থেকে তিনশ’ টাকায় পাওয়া গেলেও এখানে পাওয়া যায় দুইশ’ টাকা দরেই। এই বিক্রি টাকা দিয়েই ভোট্রা,ডাল,চালের খুদ, সরিষা, গম কিনে নিয়ে আসেন। কবুতরের জন্য ১৬টি রুমের একটি খোয়ার আছে।

এই ফার্মের দুধের চাহিদা কেমন জানতে চাইলে কচি বলেন, এতো বেশি চাহিদা তা আপনাকে বলে বুঝাতে পারবো না। আপনারা এখানে থাকতেই দেখছেন কত জন ঘুরে গেলো? তিনি বলেন আরো পাঁচশত লিটার হলেও চাহিদা পূরণ হবে না। কেন জানতে চাইলে বলে বসে এই কামার পাড়া না সারা উত্তরাতে আমার একটা সম্মান আছে আমাকে সবাই ভালো জানে আবার দুধের মান নিয়ে ও নেয় কোন প্রশ্ন।

আরো আছে ফার্মের মেইন গেটের বাহিরে বাম পাশে প্রায় ১ কাঠা জমিতে ঘাষ চাষ করেছেন। বেশ সুন্দর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সবুজের আবরণ ঘাসগুলো। প্রথমে দেখে যেন মনে হবে একটি সবুজে ঘেড়া ছোট বন। তার পাশ ঘেষে বাঁশ চিকন সুতলি দ্বারা একটি চাংলা তৈরি করে লাগানো হয়েছে পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া, ও লাউ গাছ। আবার ঘরের টিনের উপরেও দেখা যায় এই শাকসবজির গাছ।

কেন জানতে চাইলেই কচি বেগম বলেন, আবার যারা কাজ করেন ফার্মে তাদের জন্য লাগানো হয়েছে। মাঝে মাঝে বিক্রি ও করা হয়। কিছু টাকা আসে তা দিয়ে কবুতর, হাঁস-মুরগীর খাবার কেনা হয়। লিচু গাছ, লেবু গাছ, ডালিম গাছ আম গাছ আছে। নিজের বাড়ির মত করে যেন সাজিয়ে নিয়েছে কচি। কচির সঙ্গে আছেন মালা, রুপসী।

রুপসী হিজড়া বলেন, “আমি অনেক দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছি, আমি স্বাভাবিক মানুষের মত না। মেয়েলি স্বভাব থাকার জন্য পরিবারের সম্মানের দিকে তাকিয়ে ঢাকাতে চলে আসি। আমার গুরু কচি হিজড়ার কাছে এসে এখন আমি অনেক ভালো আছি। আমি সারাদিন পায়ে হেটে আপনাদের কাছে থেকে হাত পেতে যে টাকা পাই তা দিয়ে আমি নিজে চলি গ্রামে মা বাবা ও ছোট ভাই বোনের পড়াশুনা চলে। এখন গুরু মার সাথে ফার্মে কাজ করি। নিজে স্বাবলম্বী হতে চাই। ”

প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ তৃতীয় লিঙ্গের হিজড়া সম্প্রদায় স্বীকৃতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন কচি। কচি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে কত সরকার আসলো। কেউ আমাদের স্বীকৃতি দেয়নি। বঙ্গবন্ধু কন্যা আমার স্বীকৃতি দিয়েছেন। সম্মানে বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েছেন।

কচি বললেন,২০১০ সাল পর্যন্ত সুখে ছিলাম। কোনো টেনশন ছিলো না। খুব ভালো জীবনযাপন ছিলো। উত্তরা তুরাগ থানা এবং পূর্ব থানা আমার এরিয়া। এখানে আয়-রোজগার হতো। জোর আর জবরদস্তি করে নই। মুখের ভালো ভাষা ব্যবহার করে, তাদের মন খুশি করে টাকা নিতাম। কারো বেজার মুখ দেখলে নিতাম না। বা কেউ না দিতে চাইলে ফিরে যেতাম। কারো বিয়ে বাড়ি,মুসলমানির অনুষ্ঠানে যাওয়া হতো।

কচি হিজড়ার জন্ম:

বরিশালের বাকেরগঞ্জের হানুয়া গ্রামে জন্ম কচির। হানুয়া মনিতজান প্রাইমারি ও হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন তিনি। রোল প্রাইমারি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিন ছিলো। সমাজে চলতে ফিরতে কেউ দূরে ঠেলে দেননি। এখন মা আছেন। মায়ের ওষুধের খরচ প্রতিমাসে ১৫ থেকে বিশ হাজার টাকা করে দেন।

ইএ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন:

অনুরূপ সংবাদ

উপরে